” ছাতু” দুই অক্ষরের শব্দ হলেও এর গুনাগুন কিন্তু বহুল। আমরা অনেকেই সস্তা খাবার মনে করে ছাতু খাইনা। কিন্তু বিশিষ্ট ব্যক্তি ও গবেষকদের মতে একজন মানুষের জন্য ছাতু খাওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনেক। ছাতুর মধ্যে নিহিত বিভিন্ন পুষ্টিগুণের কারণে শরীরের জন্য ছাতুর কোন বিকল্প হতে পারে না। একজন মানুষের শরীরে প্রতিদিন বিভিন্ন পুষ্টিগুনের প্রয়োজন পরে, বিভিন্ন ভিটামিনের প্রয়োজনীয়তা পড়ে তো এগুলোর চাহিদা পূরণের জন্য আমাদের হাতের নাগালে কিন্তু অনেক খাবার আছে যেগুলো সম্পর্কে আমরা জানি না। তার মধ্যে একটা হল ছাতু 

আজকে আমরা আলোচনা করব ছাতু খাওয়ার বিভিন্ন উপকারিতা এবং কিভাবে ছাতু খেতে হয়। তো আপনারা যারা জানেন না তারা আমাদের আর্টিকেলটি সম্পূর্ণ পড়ুন। তাহলে ভালোভাবে বুঝতে পারবেন, চলুন তাহলে শুরু করি

ছাতু সম্পর্কে ধারনা 

পুষ্টিতে ভরপুর বহুল গুন সম্পন্ন ও কম টাকায় পাওয়া যায এমন এক ধরনের খাবার হলো ছাতু। ছাতুতে প্রোটিন, আয়রন, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস ও এন্টি অক্সিডেন্ট থাকে। ছাতুর বহুরূপ গুনের জন্য বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিরা নিয়মিত ছাতু খেতে বলেছেন। 

ছাতু খাওয়ার উপকারিতা কি? 

এখন আমরা জানবো ছাতু খাওয়ার উপকারিতা গুলো কি কি –

শরীরের এনার্জি বৃদ্ধি পায়:

নিয়মিত ছাতু খাওয়ার ফলে শরীরের এনার্জিটিক ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। ছাতু বিভিন্ন পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ হওয়ায়, বিভিন্ন ধরনের ভিটামিন ছাতুর মধ্যে নিহিত থাকায়, যখন আমরা ছাতু খাই তখন ছাতুর মধ্যে থাকা পুষ্টি ও ভিটামিন আমাদের শরীরের বিভিন্ন কাজে লেগে যায়। শরীরের যে দুর্বলতা থাকা কাটিয়ে তোলে। এছাড়া শারীরিক ও মানসিক এনার্জি বৃদ্ধি করে। 

হজম শক্তি বৃদ্ধি করে ও হজমে সাহায্য করে:

খাবার হজমে ছাতুর ভূমিকা অপরিসীম। হজমের সমস্যা ছোট বড় কম বেশি সবারই আছে। সামান্য কিছু খাবার খেলেই পেট খারাপ হয়ে যায় অথবা পেট ফেপে থাকে। তো এই সমস্যার সমাধান হতে পারে নিয়মিত ছাতু খাওয়া। ছাতু খাওয়ার মাধ্যমে শরীরের হজম শক্তি বৃদ্ধির পাশাপাশি খাবারে হজম করে ফেলে এবং ক্ষুধার পরিমাণ কমিয়ে দেয় বারবার খাওয়ার প্রয়োজন হয় না। 

কোষ্ঠকাঠিন্যের সমাধান: 

ছেলে, বুড়া, জোয়ান, বাচ্চা, সবাই মাঝে মাঝে কোষ্ঠকাঠিন্যের শিকার হয় এবং কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে পার হয়। তো এই সমস্যার একটা সহজ সমাধান হলো নিয়মিত ছাতু খাওয়া। ছাতু খেলে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হয়ে যায়। কেউ যদি অনেকদিন যাবত কোষ্ঠকাঠিন্যে ভোগেন তাহলে নানা ধরনের বড় রোগের সৃষ্টি হতে পারে। যেমন পাইলস ক্যান্সার। সবার উচিত নিয়মিত ছাতু খাওয়া। 

ব্লাড প্রেসার নিয়ন্ত্রণ:

ব্লাড প্রেসার নিয়ন্ত্রণে ছাতুর  বিকল্প হতে পারে না। বর্তমানে নীরব ঘাতক হিসেবে বলা হয় উচ্চ রক্তচাপ বা হাই ব্লাড প্রেসার কে। উচ্চ রক্তচাপের  কারণে হার্ট অ্যাটাক অথবা ব্রেন স্ট্রোকের মতো মারাত্মক অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে। এছাড়া বর্তমানে ব্রেন স্ট্রোক করে প্যারালাইজড হওয়ার হার অনেক বেশি। এসবের জন্য প্রয়োজন ব্লাড প্রেসার নিয়ন্ত্রণ আর ব্লাড প্রেসার নিয়ন্ত্রণের জন্য কার্যকরী সমাধান হলো নিয়মিত ছাতু খাওয়া। আর ছাতু খেতে হবে পানিতে শরবত করে। 

পিরিয়ডের ব্যথায় সমাধান:

পিরিয়ড চলাকালীন সময়ে শরীর থেকে রক্ত নিঃসৃত হওয়ার কারণে রক্তের সাথে শরীর থেকে বিভিন্ন প্রয়োজনীয় উপাদান বের হয়ে যায়। এর ফলে শরীরে শুরু হয়ে যায় পুষ্টি ও ভিটামিনের ঘাটতি। এসবের সমাধান হিসেবে ছাতু খাওয়া যেতে পারে কারণ ছাতুর মধ্যে বিভিন্ন ভিটামিন ও পুষ্টিগুণ সম্পন্ন থাকে যার মাধ্যমে শরীরের দুর্বলতা কাটিয়ে শরীরকে সতেজ করে তোলা সম্ভব। এছাড়া পিরিয়ডের সময় ব্যথা নিরাময়ে ছাতুর গুরুত্বপূর্ণ  ভূমিকা আছে। 

শারীরিক ও মানসিক শক্তি বৃদ্ধি:

জীবিকার সন্ধানে মানুষকে প্রতিদিন বিভিন্ন জায়গায় যেতে হয়, বিভিন্ন ধরনের পরিশ্রম করতে হয়। এর ফলে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ ভিটামিন গুলো ক্ষয় হয়ে যায়। বিশেষ করে যারা কৃষক, দিনমজুর, ভ্যানচালক, রিক্সা চালক, কুলি,এছাড়া জীবিকার সন্ধানে প্রতিদিন যারা রোদের মধ্যে কাজ করে, তখন শরীর থেকে ঘামের সঙ্গে দেহের অনেক শক্তি উপাদান বের হয়ে যায়। ফলে শরীরে নিস্তেজ ভাব ঘুম ঘুম ভাব আসে। এমতাবস্থায় যদি প্রতিদিন ছাতু শরবত করে খাওয়া হয় তাহলে শরীরে সতেজতা ফিরে আসবে কারণ ছাতু বহুল পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ। 

বার্ধক্যকালীন সময়ে ছাতুর ভূমিকা:

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যেক মানুষ বার্ধক্যকালীন বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হয়। শরীরের এনার্জিটিক ক্ষমতা গুলো নষ্ট হয়ে যায়। বার্ধক্যকালীন সময়ে প্রতিদিন এক ক্লাস করে ছাতুর শরবত করে খেলে ভালো ফলাফল পাওয়া যায় শরীরের এনার্জেটিক ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং সেই সাথে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেড়ে যায়। 

এছাড়া ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য, শিশুদের মানসিক ও দৈহিক বিকাশের জন্য, ত্বকের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করতে, ছাতু ও ছাতুর শরবত  খাওয়ার ভূমিকা অপরিসীম। 

ছাতু খাওয়ার নিয়ম গুলো কি? 

ছাতু সাধারণত দুইভাবে বানানো হয় – ১। ঝাল ছাতু, ২। মিষ্টি ছাতু 

ছাতু বিভিন্নভাবে খাওয়া যায়। ছাতু খাওয়ার জন্য ছাতুকে তৈরি করা কোন কঠিন কাজ নয় যে কেউ চাইলেই করতে পারে.. ছাতু খাওয়ার প্রচলিত কিছু নিয়ম:

  • আপনি যদি ঝাল ছাতু খেতে চান তাহলে দরকার হবে মরিচ, পেঁয়াজ, লবন, রসুন, ধনেপাতা এসব কুচি কুচি করে কাটতে হবে এবং ছাতুর সঙ্গে মিশিয়ে ঝাল ছাতু তৈরি করতে পারবেন। 
  • মিষ্টি ছাতু খাওয়ার জন্য ছাতুর সঙ্গে যোগ করতে হবে চিনি বা গুড়। 
  • শরীরের চর্বি কমানোর উদ্দেশ্যে কেউ খেতে চাইলে বা ওজন কমানোর উদ্দেশ্য থাকলে ছাতুর সঙ্গে লেবুর শরবত ও বিট লবণ মিশিয়ে শরবত করে অথবা এমনিতেও খেতে পারেন। 
  • গ্রাম অঞ্চলে চালভাজা, মরিচ পেঁয়াজ, লবণ একসঙ্গে মিশিয়ে ঢেঁকিতে পিষ্ট করে তৈরি করা হয় ঝাল ছাতু অথবা চাল ভাজার  সঙ্গে  ছোট ছোট করে নারিকেল কেটে মেশানো হয়। তারপর ঢেঁকিতে পিষ্ট  করে নারিকেল ছাতু তৈরি করা হয়। 
  • এছাড়া আম কেটে ছাতুর সঙ্গে ভালোভাবে মিশিয়ে খাওয়া যায়  মিশিয়ে। 

ছাতুর মধ্যে কি কি পুষ্টি  থাকে? 

ছাতু বহুল পুষ্টিগুণের অধিকারী। ছাতুর মধ্যে বিভিন্ন ধরনের উপাদান যেমন ফাইবার, আয়রন, ম্যাঙ্গানিজ, প্রোটিন ও ম্যাগনেসিয়াম থাকার কারণে গরমের দিনে তীব্র তাপদাহ থেকে শরীরে শীতলতা যোগানোর একমাত্র সঙ্গী হলো ছাতু।

জবের ছাতু সম্পর্কে ধারনা 

জব হলো গম জাতীয় শস্যের অন্তর্ভুক্ত আরেকটি জাত। জব উৎপাদন করা হয় ঘাস জাতীয় উদ্ভিদ থেকে যার জীবনকাল স্বল্প। পুষ্টিতে অনন্য জবের ছাতুতে রয়েছে ফাইবার, ময়শ্চার, প্রোটিন, ফ্যাট, ভুসি ও এনার্জি (৪৪০ ক্যালোরি)। আমাদের বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)তিনি নিজেও জবের ছাতু খেতে খুব পছন্দ করতেন।

আরও পড়ুন: যবের ছাতুর উপকারিতা এবং যবের ছাতু খাওয়ার নিয়ম

ছাতু খেলে কি গ্যাস হয়? 

যে কোন খাবারের কিছু সাইড ইফেক্ট থাকে। আর এই সাইড এফেক্ট গুলো নির্ধারিত হয় খাবারের পরিমাণের উপর। যদি অধিক পরিমাণে খাদ্য গ্রহণ করা হয় সেটা আমার আপনার সবার জন্যই স্বাস্থ্যঝুঁকি, স্বাস্থ্য সমস্যা, ও রোগাক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। যদি কোন ব্যক্তি বেশি পরিমাণে ছাতু খায় বা ছাতুর শরবত গ্রহণ করে তাহলে তার এসিডিটি বা গ্যাস্ট্রিকের জোর দিতে পারে। আঁশ জাতীয় খাদ্য হজমের সমস্যা, এলার্জেটিক সমস্যা যদি কোন ব্যক্তির থাকে তাহলে ছাতু না খাওয়াই ভালো। 

খালি পেটে ছাতু খেলে কি হয়? 

খালি পেটে পরিমাণ মতো ছাতু খেলে কোন সমস্যা হয় না। ছাতুর মধ্যে নুন আয়রন ও ফাইবার থাকার কারনে যদি কারো হজমে সমস্যা থেকে থাকে তাহলে খালি পেটে পরিমাণ মতো ছাতু খান বা  ছাতুর শরবত খান হজম সমস্যার সমাধান হবে। 

আমাদের কিছু কথা 

তো আজকের আলোচনার বিষয় ছিল ছাতু খাওয়ার উপকারিতা ও ছাতু খাওয়ার নিয়ম। আমরা আমাদের আর্টিকেলের মাধ্যমে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেছি। আশা করি আপনারা যথেষ্ট পরিমাণে বুঝতে পেরে। যদি আপনাদের আরো কিছু জানার থাকে তাহলে আমাদেরকে কমেন্টে জানাবেন। ধন্যবাদ। 

খাদ্য ও পুষ্টি নিয়ে আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *